ওঁ
সতীদাহ
তথাগত অনুরাধা মুখোপাধ্যায়
জ্যোতিষ্মানকে আমি ছোটবেলা থেকে চিনি। একই পাড়ায় থাকতাম। ক্লাস ফোর অবধি একসাথে পড়তাম। মেধাবী ছাত্র জ্যোতি, তাই ক্লাস ফোরের পর ও চন্দননগরের মিশনারি স্কুলে
ভর্তি হয়ে গেছিল। আমিও প্রবেশিকাতে
বসেছিলাম, চান্স পাইনি।
কিছু মানুষ থাকে যাদের ভগবান একেবারে
উজাড় করে দেন। জ্যোতিষ্মান বাগচী
ঐ শ্রেণীভুক্ত। লম্বা ছিপছিপে শরীর, একমাথা ঝাঁকরা চুল, ভাসা ভাসা স্বপ্নালু
চোখ আর তার সাথে এক অসম্ভব ক্ষুরধার মগজ। পড়াশুনা, খেলাধুলা, পাঠক্রম বহির্ভূত কার্যক্রম সবেতে জ্যোতিষ্মানের তুলনায় আমি ছিলাম
নিতান্তই নিষ্প্রভ। সবেতে ও আমাকে শত
যোজন দূরত্বে ছাড়িয়ে যেত। তাই হীনমন্যতায় ভুগতাম।
জ্যোতি কিন্তু আমায় পছন্দ করতো। বুঝিবা আমার প্রতি ছিল প্রচ্ছন্ন শ্রদ্ধাও। সেটা টেরও পেতাম। ছোটথেকেই একটু আধটু লেখালেখি করতাম বলেই হয়তো। স্কুল কলেজের ম্যাগাজিনে আমার লেখা ছাপা হতো। মোটামুটি প্রশংসাও জুটত। পরে কলেজ পাশ করতেই আমার একটা উপন্যাস একটা নামকরা পত্রিকার পুজোসংখ্যায়
ছাপা হয়ে গেল। রাতারাতি সখের লেখক
থেকে পেশাদারিত্বতে উত্তীর্ণ হলাম। একটু নাম-টামও হল।
রাস্তায় যেতে আসতে দেখা হয়ে গেলে জ্যোতিষ্মান
খোঁজ নিতো – কী রাইটার, নতুন কী লিখছ?
কী করবে জেনে? তুমি পড়ো?
নাঃ – মাথা নেড়েছিল জ্যোতিষ্মান - তবে শ্রীময়ী তোমার
খুব ভক্ত।
শ্রীময়ী আমাদের পাড়ার সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত
নারী। চোখা, উজ্জ্বল রূপ, কনভেন্টে পড়া বড়োলোকের
একমাত্র মেয়ে, মফস্বলে বড়ো হয়েও আধুনিক শহুরে ঠাঁটবাট, চালচলন। শ্রীময়ী ঐ শ্রেণীর মেয়ে যার একটু কৃপাদৃষ্টি লাভের জন্য পাড়ার সব
উঠতি বয়সের ছেলে চাতকের মতো চেয়ে থাকে, আঙ্কলরা আগ বাড়িয়ে সাহায্যের হাত এগিয়ে দেয়, প্রৌঢ়রা চোরা চোখে
দেখে, রিকশাওয়ালারা ভাড়া যেতে না করেনা… তা এ হেন বহ্নিশিখা যে জ্যোতিষ্মানের জ্যোতি
বৃদ্ধি করবে তাতে আর সন্দেহ কী? তবে শ্রীময়ী আমার লেখা পড়ে এবং পছন্দ করে জেনে একটু অবাকই হয়েছিলাম…
আরো অবাক হয়েছিলাম যেদিন শ্রীময়ী নিজে
থেকে এসে আমার সাথে আলাপ করেছিল…
তখন বাংলায় এম.এ করে ফেলেছি। চাকরিটাকরির খোঁজের সাথে লেখালেখি করছি। একদিন সকালে দুলালের চায়ের দোকানের বাইরে বেঞ্চিতে বসে সিগারেট খাচ্ছি, দেখলাম রিকশাটা আমাকে
অতিক্রম করে গিয়েই দাঁড়িয়ে গেল। রিকশা থেকে নামলো শ্রীময়ী। ভাড়া মিটিয়ে সোজা আমার দিকেই হেঁটে এলো, মুখে পরিচিতির হাসি। একই পাড়ার থাকি, তাই মুখ চেনা ছিলই তবে আগে ওর সাথে কথাটথা বলার সুযোগ হয়নি।
শ্রীকুমার বসু? জিজ্ঞাসা করলো শ্রীময়ী।
আজ্ঞে হ্যাঁ। আপনি তো মিস ঘোষাল? শ্রীময়ী ঘোষাল? মোড়ের ঐ গোলাপি বাড়িটায় থাকেন?
হ্যাঁ – ঝলমল করে উঠলো শ্রীময়ী – পুজোসংখ্যায় আপনার ‘স্মৃতি সন্ধ্যা’ পড়লাম। খুব, খুউউব ভালো লেগেছে। পড়ার পর থেকে আমি কখনো নিজের মধ্যে স্মৃতিকে দেখছি, কখনো সন্ধ্যার আধো
আঁধারে দিকভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছি। অসামান্য – নিজের মুখের কাছে আমার সিগারেট থেকে ভেসে আসা ধোঁয়া সরাতে সরাতে
বলল শ্রীময়ী।
ধন্যবাদ – বলে আধ-খাওয়া সিগারেটটা ফেলে চটি দিয়ে
পিষে দিলাম।
ওকী, অতটা নষ্ট করলেন?
ও কিছু না। শুনেছি প্যাসিভ স্মোকিং নাকি আরো ক্ষতিকর। আপনি বাংলা বই পড়েন দেখে অবাক লাগছে।
কেন, এরকম কেন বলছেন? বাংলাটা কি আমার মাতৃভাষা
নয়?
অবশ্যই। তবে আজকাল ইংরাজি পরিবেশে পড়াশুনা করা ছেলেমেয়েরা বাংলার খুব একটা
ধার ধারেনা তো, তাই বললাম। তবে আপনি এর ব্যতিক্রম। ভালো লাগলো।
আপনার প্রতি কিন্তু আমার একটা অনুযোগ
আছে – অনুযোগের সুরটা বোধহয়
মেয়েদের গলায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসে।
বলুন।
আপনি কিন্তু সন্ধ্যাকে বড়ো বেশি ডিপ্রাইভ
করিয়েছেন। বেচারি জীবনে কিছুই
পেলো না। এমনকি ওর বয়ফ্রেন্ড
রজতের থেকেও নিজেকে দূরে সরিয়ে ফেললো। ঝপ্ করে যেন বিলীন হয়ে গেল সন্ধ্যা।
তাইতো হয়। একটু ভেবে দেখুন, সন্ধ্যার – গোধূলির – পরিসর কতটুকু?
এটা তো ভাবিনি! দাঁড়ান দাঁড়ান, এই দ্ব্যর্থকটা স্মৃতি
নামটার মধ্যেও রয়েছে, তাইনা?
উত্তর না দিয়ে মৃদু হাসলাম আমি। শুনলাম শ্রীময়ী বলছে,
অথচ এর ব্যবহার এতো সাট্ল যে আপনি ধরিয়ে না
দিলে বুঝতেই পারতাম না।
তা নয়। আসলে ঐ লেভেলে – মাথার ওপরে হাত দিয়ে বাতাসে একটা মঞ্চ বানাতে বানাতে বললাম – উঠতে পারলে লোকে দেখবেন
এই লেখা নিয়েই কতো কাটাছেঁড়া করে। তখন দেখবেন সবাই ঐ সূক্ষ্ম, অতীন্দ্রিয় ব্যাপারগুলো স্বয়ং লেখকের
থেকেও বেশি বুঝে গেছে।
যাঃ। এটা আপনি বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলছেন।
একদম না। মনে আছে সত্যজিৎবাবুর একটা ছবিতে কলকাতার রাস্তার দৃশ্যে একটা ল্যাম্পপোস্টের
বাতি ফিউজ দেখা গেছিল। সমালোচক এবং জনগণ
তার কতরকমের অন্তর্নিহিত অর্থ বার করে ফেলেছিল। পরে পরিচালক মশাই স্বীকার করেছিলেন ওটা তিনি খেয়ালই করেননি। ভাবুন।
খিলখিলিয়ে উঠেছিল শ্রীময়ী।
সেই শুরু। এরপর থেকে দেখা হলেই শ্রীময়ী খানিক আড্ডা মেরে যেতো। কখনো দুলালের বেঞ্চিতে, কখনো গোধূলিবেলায় গঙ্গার পাড়ের বাঁধানো
ঘাটে। সাহিত্য আর সিনেমা
নিয়েই কথা হতো বেশি। সম্পর্কটা আপনি থেকে
তুমি তে নেমে এসেছিল। আমার কেন জানিনা ধারণা
হয়ে গেছিল যে শ্রীময়ী আমার প্রেমে পড়েছে। নিজের বেশভূষার প্রতি যত্নবান হতে শুরু করেছিলাম। শরীরে ঘেমো গন্ধ ঢাকার জন্য একটা সস্তার সেন্ট পর্যন্ত ব্যবহার করা
শুরু করেছিলাম। তাই একদিন নিভৃতে
আমার অন্তরঙ্গতা একটু মাত্রা ছাড়াতেই ছিটকে উঠে দাঁড়িয়েছিল শ্রীময়ী। চাপা স্বরে তিরস্কার জানিয়েছিল – ছিঃ শ্রীকুমারদা, ছিঃ। আপনাকে আমি শ্রদ্ধা করি। এভাবে নিজেকে নীচে নামাবেন না…
অপমানে কান লাল – না, লাল নয়, কালো শরীরে লাল বোঝা
যায় না, বেগুনি – হয়ে উঠেছিল আমার। রাতে মুখ ধুতে গিয়ে
বেসিনের আয়নায় নতুন করে আবিষ্কার করেছিলাম নিজেকে। বেঁটে, কালো, মাথার চুল উঠতে শুরু করে দিয়েছে, তৈলাক্ত গালে ব্রণর দাগ… রাস্তার মাঝে ষাঁড়ের
গুঁতো খেলেও কেউ সাহায্যের হাত বাড়াবে না… সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র…
আমার ঔকাতের শিক্ষা পাওয়ার পর থেকে শ্রীময়ীকে
এড়িয়ে চলতে লাগলাম। কানাঘুষায় শুনতাম
শ্রীময়ী নাকি জ্যোতিষ্মানের সাথে লড়াচ্ছে। অপমানের জ্বালা ভুলতে পারছিলাম না। যেতে আসতে শ্রীময়ীর সাথে দেখা হলেই গায়ে বিছুটি পাতার ঘষা টের পেতাম। ঠিক করলাম এই মফস্বল
ছেড়ে আমায় শ্রীময়ীর থেকে দূরে কোথাও চলে যেতে হবে।
ততদিনে ঠিক করে ফেলেছি যে লেখাটাকেই
জীবনের পেশা করবো। শুরুটা মন্দ হয়নি। বেশ কয়েকটা লেখা পত্রপত্রিকায় ছেপে বেরোল। বই-টইও বেরোল খান চারেক। কিন্তু পয়সাকড়ির আমদানি বিশেষ হল না। তাই ইচ্ছের বিরুদ্ধে কয়েকটা ট্যুইশন নিলাম। সুনীল শীর্ষেন্দুর লেভেলে না গেলে যে শুধু বাংলা গপ্প লিখে রান্নাঘরের
চুল্লি চলে না সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম। শুনেছি বিমল মিত্র মহাশয় স্রেফ সাহিত্য চর্চা করার জন্য চাকরি ছেড়েছিলেন। সমরেশ বসুও অফিস টাইমের মতো টাইম ধরে কলম পিষতেন। কিন্তু শ্রীকুমার বসু তো আর সমরেশ বসু নন…।
ওদিকে জ্যোতিষ্মান তখন ইঞ্জিনিয়ারিং
পাশ করে আমেদাবাদে ম্যানেজমেন্ট করছে। জ্যোতিষ্কের মতো আমাদের এই ছোট্ট শহরের ধরাছোঁয়ার বাইরে তার নিজস্ব
কক্ষপথে হিরের কেরিয়ার বানাতে ব্যস্ত।
এইসময় একদিন মুম্বই থেকেও ডাক এল। মুম্বইয়ের এক বাঙালি পরিচালক আমার উপন্যাস ‘স্মৃতি সন্ধ্যা’ পড়ে একেবারে মুগ্ধ। উনি এটা নিয়ে হিন্দিতে সিরিয়াল বানাতে চান। স্মৃতি আর সন্ধ্যা নামে দুই সইয়ের সম্পর্ক এবং তার জটিলতা নিয়ে কাহিনী। উনি নাকি লিড রোল দুটির জন্যে নামকরা দুই অভিনেত্রীর সাথে কথাও বলে
ফেলেছেন। আমার উপন্যাসের স্বত্ব
কিনতে চাইছেন। তার জন্য এক লক্ষ
টাকা দাম দিতে তিনি রাজি। সাথে স্ক্রিপ্ট লেখার কাজ। তাতে প্রতি এপিসোডে বিশ হাজার।
এদ্দিন ধরে লেখালেখি করে যা উপার্জন
করেছি, নিঃসন্দেহে ওখানে তার অনেকগুণ বেশি উপার্জন করবো। আরো একটা কারণ হল শ্রীময়ীর থেকে দূরে
চলে যাওয়া। তাই একদিন যা-থাকে-বরাতে বলে বাক্স প্যাঁটরা গুটিয়ে মুম্বই রওনা দিলাম।
ভাগ্য সহায় ছিল। ‘স্মৃতি সন্ধ্যা’র ভালো টি.আর.পি পেল। পরপর কয়েকটা স্ক্রিপ্ট লেখার কাজ পেলাম – এবং সেগুলো একটাও আমার লেখা উপন্যাসের
নয়। নিজস্ব সৃজনশীলতা জলাঞ্জলি দিয়ে অন্যের লেখা টিভির ভাষায় ব্যক্ত করতে ব্যস্ত হয়ে উঠলাম আমি। পরবর্তী পাঁচ-ছ বছর কাজের মধ্যে
কেটে গেল হু হু করে। পয়সাকড়ি কিছু হল ঠিকই, কিন্তু আমার ক্রিয়েটিভিটি
কবে যে অস্তাচলে চলে গেছে টের পাইনি…
সময় চিরকাল এক থাকে না। কয়েকটা সিরিয়াল মার খেতেই চিত্রনাট্য লেখার কাজে ভাঁটা পড়ল। শেষে একদিন দেখলাম কাজই নেই। অনেকদিন পর নিজের লেখালেখি নিয়ে বসলাম। বেশ কয়েকটা উপন্যাস আধখেঁচড়া পড়ে ছিল। সেগুলো শেষ করতে গিয়ে দেখলাম আমার লেখনীর ধার কমে গেছে। সামনে ছাপানো গপ্প দেখে চিত্রনাট্য লেখা এক জিনিস, আর মগজ হাতড়ে সঠিক
প্লট লিপিবদ্ধ করা আরেক। বছর ছয়েক আগে যখন
মুম্বই এসেছিলাম, কিছু প্রকাশক এবং পত্রপত্রিকার থেকে লেখার জন্য অনুরোধ আসতো। কিন্তু তখন এতো ব্যস্ত থাকতাম যে সেই সব অনুরোধ উপেক্ষা করতে বাধ্য
হতাম। এখন যখন ফের নতুন
করে সেইসব প্রকাশনা গৃহ আর পত্রপত্রিকার দ্বারস্থ হলাম, উপেক্ষিত হতে থাকলাম। চিঠি বা মেইলের কেউ কোনো উত্তর করে না। দপ্তরে ফোন বেজে যায় কেউ তোলে না। প্রকৃতির নিয়মেই সব ভ্যাকুয়াম ঠিক পূরণ হয়ে যায়। টের পেলাম আমার ফেলে আসা শূন্যস্থান পূরণ করে ফেলেছে বেশ কিছু প্রতিভাবান
লেখক-লেখিকা।
রেস্তয় টান পড়তেই মুম্বই ছেড়ে পশ্চিমবাংলায়
আমার ছোট্ট মফস্বলে ফিরতে হল। শহর ছাড়ার পর শ্রীময়ীর সাথে যোগাযোগ প্রায় ছিলই না। তবে খবর পেয়েছিলাম শ্রীময়ীর সাথে জ্যোতিষ্মানের বিয়ে হয়ে গেছে… তবে এবারে এসে এই
একমাসে শ্রীময়ীর দেখা পাইনি। বরের সাথে প্রবাসী হয়ে গেছে বোধ হয়…
প্রত্যাখ্যাত হতে হতে অবশেষে একদিন আমার
নতুন উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি নিয়ে কলকাতায় আমার পুরানো প্রকাশনা গৃহের দ্বারস্থ হলাম। সামনাসামনি কথা বললে যদি কাজ হয়। হল না। মাসখানেক অতিক্রান্ত
হবার পরেও যখন কোনো জবাব এলো না, বাধ্য হয়েই ফোন করলাম।
আরে ধুর মশাই, এই সব রিলেশনশিপ-টিপের কচকচানি আর
আজকাল চলে না। কোনো একটা কনটেম্পোরারি
ঘটনার প্রেক্ষাপটে থ্রিলার-ট্রিলার কিছু লিখুন। গতি চাই, মশাই, গতি। তার সাথে সেক্স-ভায়োলেন্সের গার্নিশিং। নয়তো ঝুঁকিটা আপনি নিন। মানে, সেলফ পাবলিকেশন। সব কাজ আমরা করে দেব আপনি শুধু খরচাটা দেবেন…
অপমানের জ্বালা সারা গায়ে মেখে সন্ধেবেলায়
বাসায় ফিরলাম। স্টেশনে হঠাৎ শ্রীময়ীর
সাথে দেখা। সাধারণ শাড়ি ব্লাউজ
পড়া মলিন, ক্লান্ত চেহারা। ওর সেই আগেকার জেল্লাটাই যেন বিলুপ্ত।
একী, শ্রীময়ী? তুমি – মানে তোমরা – এখনও এখানেই থাকো বুঝি?
হ্যাঁ – বলল শ্রীময়ী – তবে বাবা মারা যাবার
পর ঐ বাড়ি বেচে চাঁপাতলায় বাড়ি ভাড়া করে থাকি…
চাঁপাতলা আমার বাড়ি যাবার পথেই পড়ে, তাই শ্রীময়ীকে নামিয়ে
দেবার প্রস্তাব দিলাম। রিকশাতে যেতে যেতে
বেশি কিছু ভেঙে বলল না শ্রীময়ী, তবে বুঝলাম ওরা ভালো নেই। হাওড়াতে একটা ইস্কুলে চাকরি করতে হয় ওকে – মুখে না বললেও টের
পেলাম – বাধ্য হয়েই।
রিকশা থেকে নামার সময় ওদের বাড়িতে আসার আমন্ত্রণ
জানিয়ে নেমে গেল শ্রীময়ী বাগচি। পরদিন বিকেলে ওদের বাড়িতে গেলাম। সময় কাটানোর জন্যে নয়, কৌতূহল মেটানোর জন্য। আই.আই.এম থেকে পাশ করা বরের সাথে মিসেস বাগচির তো এখন বিদেশ, বা নিদেনপক্ষে দিল্লি
বা মুম্বইয়ের বিলাসবহুল কোনো গগনচুম্বী ফ্ল্যাটে থাকার কথা। চাঁপাতলায় জরাজীর্ণ দু-কামরার ভাড়ার ফ্ল্যাটে নয়।
জ্যোতিষ্মান বাড়িতেই ছিল। চেহারায় সেই আগের জ্যোতি আর নেই। মধ্যপ্রদেশ উৎকটভাবে স্ফীত। চোখের কোলে মাংসের প্যাড। মেকি উৎসাহ দেখিয়ে আপ্যায়ন করলো। তারপর আই-মি-মাইসেলফের ঝাঁপি খুলে বসলো। অনেক অযাচিত জ্ঞান দিলো। বাঙালি দশটা-পাঁচটার চাকরি ছাড়া কিছু ভাবতে পারে না, কিন্তু ও সে বান্দা নয়। ও সবাইকে দেখিয়ে দেবে যে বাঙালিও ব্যবসায় সফল হতে পারে। সম্প্রতি লাইভ-স্টকের ব্যবসা শুরু করেছে। আদিসপ্তগ্রামে গরু ছাগল ভেড়ার খামার। দুধ আর মাংস সাপ্লাই হবে। পোল্ট্রি? – নাহ্। ওটা আজকাল হ্যাংলা-প্যাংলা সবাই করে। তবে চব্বিশ পরগণায় চিংড়ির ভেড়িও লিজ নিয়েছে। অনেক ভাট বকার পর অবশেষে আসল কথাটা পারলো জ্যোতিষ্মান। আমি কি ওকে লাখ দুয়েক টাকা ধার দিতে পারবো? ইদানীং ক্যাশ ফ্লো নিয়ে ঝামেলা চলছে। ও মাসদুয়েকের মধ্যেই শোধ করে দেবে। সুদ সহ…
দেখলাম শ্রীময়ীর চোখের ইশারা। বুঝতে অসুবিধা হল না যে ও মানা করছে…
বাড়ি ফেরার সময় শ্রীময়ী আমাকে নীচে পৌঁছে
দিতে এসে বলল,
কাল দুপুরের দিকে একবার আসতে পারবে, শ্রীকুমারদা? অনেক কথা আছে… ও তখন বাড়ি থাকে না…
নতুন গপ্পের গন্ধ পেলাম আমি। এগুলোই তো আমাদের রসদ। পরদিন দুপুর দুটো নাগাদ শ্রীময়ীদের ফ্ল্যাটে পৌঁছলাম। আমার জন্যেই অপেক্ষা করছিল শ্রীময়ী। ভিতরে নিয়ে বসাল। একটু সঙ্কোচ হচ্ছিল, ভয়ও করছিল। সেটা আন্দাজ করেই শ্রীময়ী বলল,
তুমি নিশ্চিন্ত থাক শ্রীকুমারদা। জ্যোতি আজ কলকাতা গেছে। সন্ধের পর ফিরবে।
তোমাদের এ দশা হল কী করে? – মোবাইল ফোন সার্ফ
করতে করতে শুধলাম আমি।
খুব অ-সুখে আছি শ্রীকুমারদা – এম.বি.এ করার পর ও দুটো
ভালো চাকরি পেয়েছিল। কিন্তু চুরির দায়ে
দুটোই খোয়ালো…
চুরি? জ্যোতিষ্মান চুরি করেছিল? অবিশ্বাস্য। - ফোন সার্ফ করার অছিলায় ভয়েস রেকর্ডারটা অন করলাম আমি। পরে কাজে লাগবে।
এরপর একে একে জ্যোতিষ্মানের সব গুণপনার
কথা নাগাড়ে বলে গেলো শ্রীময়ী। চাকরি থেকে বিতাড়িত হওয়া। মাথায় ব্যবসার ভূত চাপা। উদ্ভট উদ্ভট স্টার্ট-আপের আইডিয়া। ব্যাংক-লোন নিয়ে পয়সা ওড়ানো। তারপর ব্যাঙ্কের আদায়কারীদের থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়ানো। শেষপর্যন্ত শ্রীময়ীকে চাপ দিয়ে ওদের পৈতৃক বাড়িটা বিক্রি করে লোন
শোধ দেওয়া, শ্রীময়ীর সই জাল করে ব্যাঙ্ক খালি করা, রোজ নেশায় বেহেঁড হয়ে বাড়ি ফেরা, প্রতিবাদ করতে গেলে
গালিগালাজ করা… অবশেষে একদিন ওর পয়সাওয়ালা গেলাসের বন্ধুদের সাথে শ্রীময়ীকে শুতে বাধ্য করা…
আমি ওকে চিনতে পারিনি শ্রীকুমারদা, ওর সোনায় মোড়া খোলসের
মধ্যে লুকিয়ে থাকা লোভী, নির্বোধ জন্তুটাকে চিনতে পারিনি… হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলো শ্রীময়ী। আমি গিয়ে ওর পিঠে হাত রাখলাম। আবেগের তোড়ে আমায় জাপটে ধরে আমার বুকে মুখ লুকালো শ্রীময়ী। ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলতে লাগলো – আমায় বাঁচাও শ্রীকুমার, আমাকে এই নরক থেকে
উদ্ধার করো…
আবেগের প্লাবন মেয়েদের মানসিকভাবে নড়বড়ে
করে দেয় – সিরিয়ালের স্ক্রিপ্ট লিখতে গিয়ে এরকম দৃশ্য আমি বেশ কয়েকবার লিখেছি… থুতনি ধরে শ্রীময়ীর
মুখ তুলে ওর ঠোঁটে গভীরভাবে চুমু খেলাম আমি। এবারে আর শ্রীময়ী বাধা দিলো না। ওর জিহ্বার স্পর্শে পেলাম আশকারার স্বাদ। ওকে জড়িয়ে ধরে ওরই বিছানায় ফেললাম আমি…
আমায় ভালবাসো শ্রীকুমার… ফিসফিস করে বলল শ্রীময়ী।
***
ঐ ঘটনার পরদিন মুঠোফোনে বন্দি অডিও ক্লিপ
নিয়ে আমি কলকাতায় মামাবাড়িতে চলে গেলাম, যাতে চেষ্টা করলেও শ্রীময়ী আমায় খুঁজে না পায়… কল আসতো, তুলতাম না। মেসেজ আসতো, মুছে দিতাম – কারণ তখন আমার সারা মাথা জুড়ে বন বন করে পাক খাচ্ছে নতুন উপন্যাসের
প্লট ও তার তিন-চারটে প্রকরণ। আমার দরকার ছিল নিরবচ্ছিন্ন, অখণ্ড পরিসর…
আমার নতুন উপন্যাস ‘সতীদাহ’ সাত মাস পর একটি নামি
পুজোবার্ষিকীতে প্রকাশিত হল। সতী ঘোষাল নামে এক সুন্দরীর উত্থান ও পতনের কাহিনী। হুবহু শ্রীময়ীর জীবন তুলিনি, শ্রীময়ীর থেকে আরও বেশ কয়েক পোঁচ কালো
করে এঁকেছিলাম সতীর চরিত্র। সবাইকে সুবিধেমত ব্যবহার করে বেড়ে ওঠা সুন্দরি কীভাবে নিজেই শেষপর্যন্ত
নিজেই স্বামী দীপ্তিময় দ্বারা ম্যানিপুলেটেড হয়ে অন্তর্দহনে জ্বলে শেষ করে ফেলল নিজেকে
তার নিকষ কালো আলেখ্য। গল্পের মূল কাঠামোর
মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতার মাত্রা অতিক্রম না করে ঢুকিয়েছিলাম কিছু পার্শ্বচরিত্র, কিছু সমাপতন, পরিমিত ডোজের যৌনতা
এবং সহিংসতা। সতী ঘোষালের আগুনে
পুড়ে মৃত্যু এ কাহিনীর পরিণতি। সেটা সেলফ ইমোলেশন না পতি দ্বারা হত্যা পাঠকদের সেই ধন্দ দূর করা
হয়নি। ‘সতীদাহ’ যে হিট তার প্রমাণ পেলাম
যখন দুটো প্রকাশনী বইটা প্রকাশ করার ইচ্ছে দেখাল। এছাড়া, দেখলাম পত্রিকা এবং বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়াতেও বইটি নিয়ে বেশ চর্চা
হচ্ছে…
আজ অনেকদিন পর দেখলাম শ্রীময়ী ফের কল
করছে। এবারে তুললাম।
অভিনন্দন। অনেকদিন পর তোমার লেখা পড়লাম। ভালো লিখেছ।
কেমন আছো, শ্রীময়ী?
তুমি কেন এটা করতে গেলে শ্রীকুমারদা? আমি তো তোমার কোনো
ক্ষতি করিনি।
মনে মনে বললাম – একদিন আমায় প্রশ্রয়
দিয়েছিলে। তারপর হঠাৎই অচ্ছুতের
মতো আমায় ঠেলে সরিয়ে দিয়েছিলে, মনে পড়ে? তোমার জন্যে আমি নিজের সৃজনশীলতা বিসর্জন দিয়ে অন্যের লেখার স্ক্রিপ্ট
বানিয়ে প্রায় শেষ করে ফেলেছিলাম নিজেকে। ডেলিলা যেমন স্যামসনের কেশ কেটে তাকে শক্তিহীন করে দিয়েছিল, তুমিও কেড়ে নিয়েছিলে
আমার ক্রিয়েটিভিটি, আমার একমাত্র সম্পদ। সেটা ক্ষতি নয়? হৃত সম্পদ ফিরে পেতে তাই তোমাকে ব্যবহার
করতেই হল। মুখে বললাম,
‘সতীদাহ’ তে তোমার জীবনের কিছু
কিছু ঘটনা ব্যবহার করেছি, তাই বলছ?
উঁহু – বলল শ্রীময়ী - সেজন্য নয়। সেইদিন দুপুরের ঘটনার কথা জ্যোতিষ্মান কীভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খ জানলো? কেন তুমি এটা ওকে
বলতে গেলে শ্রীকুমারদা? আমি তো তোমায় বিশ্বাস করেছিলাম। আমি তো এমনিতেই পলে পলে জ্বলছি। আমার পোড়া ত্বকে লঙ্কার গুঁড়ো দিয়ে কী লাভ হল তোমার?
মনে মনে বললাম – তুই তো বরের ইচ্ছেতেই
অন্যের সাথে শুয়ে বেড়াস, সেবেলা? এখন সতীগিরি হচ্ছে? খানিক চুপ থেকে বললাম – কীভাবে জেনেছে ওকেই
জিজ্ঞাসা করো।
ফোন কেটে দিলো শ্রীময়ী।
***
শ্রীময়ী বাগচির মৃত্যুর খবর আমি পেলাম
দুদিন পর, খবরের কাগজে। ‘গায়ে আগুন দিয়ে গৃহবধূর
আত্মাহুতি’ শিরোনাম দিয়ে ন-দশ লাইনের একটা ছোট্ট খবর… সুইসাইড নোট পাওয়া গিয়েছে। তবুও, শ্রীময়ীর স্বামী জ্যোতিষ্মান আপাতত পুলিশ কাস্টডিতে। বধূহত্যার ব্যাপারটা এখনই পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না…
খুব আশাহত হলাম। আশা করেছিলাম আমি যে সেই দুপুরের অডিও ক্লিপটা জ্যোতিষ্মানকে পাঠিয়ে
দিয়েছিলাম সেটা শ্রীময়ী আবিষ্কার করবে এবং তাই নিয়ে আমার সাথে আর এক প্রস্থ বচসা করবে, জানতে চাইবে আমি কেন
এরকম করতে গেলাম, আর আমি তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করবো ওর অসহায়তা… তার আগেই চলে গেল। ধুস্ শালা। মজাটাই মাটি…
মুম্বই
১৫ মার্চ ২০২৪
Comments
Post a Comment